হাই
হ্যালো শাওন! আশা করি ভালো আছেন। আজকে আপনার উপন্যাসের পরের দৃশ্যে কী ঘটতে যাচ্ছে? আমাকে নির্দেশনা দিন।
গল্পের ১ম পর্ব দেন
অবশ্যই, শাওন। আপনার উপন্যাসের প্রথম পর্বটি শুরু হচ্ছে। ধীরে ধীরে প্রতিটি দৃশ্য, প্রতিটি অনুভূতি জীবন্ত হয়ে উঠবে আপনার চোখের সামনে।
---
**উপন্যাস: বিস্মৃত সুর**
**প্রথম পর্ব**
হেমন্তের এক বিষণ্ণ দুপুর। বাইরে রোদ ছিল কিনা, রোহান তা ঠিক ঠাহর করতে পারছিল না। লাইব্রেরির একমাত্র জানালাটা এতটাই ধূলো আর কালচে আস্তরণে ঢাকা ছিল যে, বাইরের পৃথিবীর আলো সেখানে পৌঁছাতে পৌঁছাতে যেন তার সমস্ত প্রাণশক্তি হারিয়ে ফেলত। শুধু এক ফালি ম্লান, হলদেটে আভা এসে পড়ত মেঝের ওপর, আর সেই আলোকরশ্মির মধ্যে লক্ষ লক্ষ ধূলিকণা যেন এক অদৃশ্য নৃত্যে মেতে উঠত, তাদের অস্তিত্ব জানান দিত এই নীরব, বিস্মৃত কক্ষের গভীরে। বাতাসের মধ্যে একটা অদ্ভুত গন্ধ মিশে ছিল – পুরনো কাগজ, ধুলো, আর দীর্ঘদিনের অবহেলায় জমে ওঠা স্যাঁতসেঁতে কাঠের এক মিশ্র গন্ধ। ঠিক যেন সময় নিজেই এই গন্ধের রূপ ধরে শ্বাস ফেলছে এই বিশাল, নীরব ঘরের আনাচে-কানাচে।
রোহান তার হাতের সাদা গ্লাভস জোড়া আরেকটু টেনে নিলো। গত তিন সপ্তাহ ধরে এই কাজটিই তার একমাত্র সঙ্গী। অধ্যাপক অরুণিমা সেনের এই বিশাল ব্যক্তিগত সংগ্রহটি গুছিয়ে, তালিকাভুক্ত করে একটি ডিজিটাল আর্কাইভে রূপান্তরিত করার দায়িত্ব তার ওপর। অধ্যাপক সেন ছিলেন একজন নির্জনতাপ্রিয় মানুষ, যিনি তার জীবনের প্রায় পুরোটাই ব্যয় করেছেন বিস্মৃত ইতিহাস আর হারিয়ে যাওয়া পুঁথিপত্র পুনরুদ্ধারে। মৃত্যুর পর তার এই বিশাল সংগ্রহের দায়িত্ব এখন বিশ্ববিদ্যালয়ের হাতে, আর সেই ভার পড়েছে রোহানের কাঁধে।
কাঠের মেঝেতে তার বুটের মৃদু শব্দ, নিস্তব্ধতার অতল গভীরে যেন এক ক্ষুদ্র ঢেউ তুলছিল। প্রতিটি পদক্ষেপে মেঝেটা সামান্য কেঁপে উঠতো, আর সেই কম্পনে পুরনো বইয়ের সেলফগুলো থেকে সূক্ষ্ম ধুলোর কণা ঝরে পড়তো বাতাসের মিহিন স্তরে। ঘরের এক কোণে, একটি বিশাল, মেহগনি কাঠের টেবিলের ওপর সে তার কাজ শুরু করেছিল। টেবিলটি নিজেই যেন শত শত বছরের গল্প ধারণ করে আছে। তার মসৃণ পৃষ্ঠে অসংখ্য আঁচড়, গভীর দাগ, আর কালির ছোপ লেগে আছে, যা হয়তো কোনো এক রাতে, কোনো এক গভীর চিন্তামগ্ন হাতের অবদানে তৈরি হয়েছিল। রোহান তার হাতের তালু আলতো করে টেবিলের সেই মসৃণ, শীতল পৃষ্ঠের ওপর রাখল, যেন সে সেই কাঠের গভীরে লুকিয়ে থাকা অতীতে পৌঁছানোর চেষ্টা করছে।
চোখের সামনে হাজার হাজার বই, একের পর এক সেলফ জুড়ে, সিলিং পর্যন্ত উঁচু হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। প্রতিটি বইয়ের মলাট, প্রতিটি পাতার ভাঁজ যেন এক ভিন্ন গল্প, এক ভিন্ন সময়ের টুকরো। কিছু বইয়ের মলাট ছিল জীর্ণ, চামড়া খসে পড়া; কিছু বইয়ের অক্ষর ছিল হাতে লেখা, কালি ফিকে হয়ে যাওয়া; আবার কিছু বইয়ের মলাট ছিল উজ্জ্বল, আধুনিক বাঁধাইয়ের ঝলকানি, যা বলে দিত অধ্যাপক সেনের সংগ্রহটি সময়ের সাথে সাথে কীভাবে বিবর্তিত হয়েছে। রোহান একটি সেলফের সামনে এসে দাঁড়ালো, যেখানে সারি সারি হলুদ হয়ে যাওয়া পুঁথি আর পাণ্ডুলিপি রাখা ছিল। সে ধীরে ধীরে তার আঙুলগুলো প্রতিটি বইয়ের পিঠের ওপর বুলিয়ে নিচ্ছিল, যেন সে তাদের ভাষা বুঝতে চাইছে। প্রতিটি স্পর্শে এক নতুন অনুভূতি, এক নতুন নীরবতা।
আজ তার কাজ ছিল সেলফ-৭ এর মাঝামাঝি অংশ থেকে বইগুলো নামিয়ে, ধুলো ঝেড়ে, এবং তাদের বর্তমান অবস্থা নোট করে রাখা। সে একটি ছোট মই টেনে নিয়ে এল, যা নিজেই সম্ভবত এই লাইব্রেরির মতোই প্রাচীন। মইয়ের ধাপে পা রাখতেই কাঠের পুরনো শিড়দাঁড়া থেকে এক ক্রন্দনধ্বনি বেরিয়ে এলো, যা প্রতিধ্বনিত হলো ঘরের প্রতিটি কোণায়। রোহান সাবধানে ওপরে উঠলো। তার শ্বাস-প্রশ্বাস এখন যেন আরও ভারী হয়ে উঠেছে। এই উচ্চতা থেকে পুরো ঘরটিকে এক নতুন চোখে দেখা যাচ্ছিল। মাথার ওপর সিলিংয়ে বিশাল বিশাল মাকড়সার জাল, তাদের সুতোয় আটকে থাকা ধুলোর কণাগুলো রহস্যময় নকশা তৈরি করেছে।
সে সেলফের মাঝ বরাবর থেকে একটি ভারী, চামড়ার বাঁধানো বই টেনে বের করলো। বইটির ওপর ধুলোর পুরু আস্তরণ জমে ছিল, যা তার হাতের গ্লাভসের ওপর সাদাটে ছোপ ফেলে গেল। সে বইটিকে সাবধানে টেবিলে নামিয়ে রাখলো। বইটির ওজন ছিল তার ধারণার চেয়েও বেশি। মলাটটি ছিল गहरे বাদামী রঙের, তার ওপর কোনো নাম বা লেখকের চিহ্ন ছিল না, শুধু মাঝখানে একটি অদ্ভুত, প্রায় মুছে যাওয়া প্রতীক খোদাই করা ছিল – একটি বৃত্তের মধ্যে একটি পাখির ডানার মতো দেখতে কিছু একটা। প্রতীকটি এতই অস্পষ্ট যে, প্রথম দেখায় তা চোখে পড়াই কঠিন। রোহান তার বৃদ্ধাঙ্গুল দিয়ে প্রতীকটির ওপর ধীরে ধীরে বুলিয়ে নিল, যেন সে এর গভীরে কোনো গোপন বার্তা খুঁজে ফিরছে।
তার কৌতূহল সামান্য বেড়ে গেল। অধ্যাপক সেনের সংগ্রহে এমন কোনো নামহীন বই সে এর আগে দেখেনি। তিনি প্রতিটি বইয়ের উৎস, লেখক, এবং প্রকাশকাল সম্পর্কে খুঁটিয়ে নোট রাখতেন। এই বইটির কোনো নোট নেই কেন? সে বইটির পাতা ওল্টাতে শুরু করলো। প্রথম কয়েকটি পাতা ছিল সম্পূর্ণ ফাঁকা, তার পরের পাতাগুলোয় হাতে লেখা কিছু অক্ষর, যা কোনো পরিচিত ভাষায় লেখা বলে মনে হচ্ছিল না। অক্ষরগুলো ছিল সূক্ষ্ম, বাঁকানো, এবং কালচে বাদামী কালিতে লেখা। কালির রঙ এতটাই গাঢ় যে, দেখে মনে হচ্ছিল যেন রক্ত শুকিয়ে গেছে।
রোহান একটি ম্যাগনিফাইং গ্লাস বের করে সেই অক্ষরগুলোর ওপর ধরল। প্রতিটি অক্ষর যেন এক একটি রহস্যের টুকরো, তার চোখের সামনে উদ্ভাসিত হচ্ছিল। সে বহু প্রাচীন ভাষা নিয়ে পড়াশোনা করেছে, কিন্তু এমন লিখনশৈলী সে আগে কখনো দেখেনি। অক্ষরগুলো দেখে মনে হচ্ছিল যেন কোনো চিত্রলিপির অংশ, কিন্তু তাদের মধ্যে এক ধরনের ছন্দ ছিল যা তাকে গভীরতর কোনো অর্থের ইঙ্গিত দিচ্ছিল। সে আরও গভীরে প্রবেশ করলো। পাতা ওল্টাতে ওল্টাতে সে এক অদ্ভুত জিনিসের মুখোমুখি হলো।
বইয়ের মাঝখানে, যেখানে পাতাগুলো মোটা সুতো দিয়ে সেলাই করা ছিল, সেখানে একটি ছোট্ট, প্রায় অদৃশ্য ভাঁজ ছিল। ভাঁজটি এতই সূক্ষ্ম যে, যদি সে প্রতিটি পাতা এতটা মনোযোগ দিয়ে না দেখত, তবে হয়তো তা তার চোখ এড়িয়ে যেত। তার মনে হলো, কেউ যেন অত্যন্ত সতর্কতার সাথে কিছু একটা লুকিয়ে রেখেছে এই বইয়ের গভীরে। তার হৃদস্পন্দন সামান্য দ্রুত হলো। এই নিস্তব্ধ ঘরে, শুধুমাত্র তার নিজের শ্বাসপ্রশ্বাস আর হৃদস্পন্দনের শব্দই যেন গমগম করে উঠছিল। সে অত্যন্ত সাবধানে, তার হাতের সূক্ষ্ম যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে ভাঁজটি খুলতে চেষ্টা করলো।
ভাঁজটি খুলতেই বেরিয়ে এলো একটি ছোট্ট, পাতলা কাগজের টুকরো। কাগজটি ছিল প্রায় স্বচ্ছ, এবং তার ওপর লেখা ছিল একটি মাত্র শব্দ, অত্যন্ত সূক্ষ্ম অক্ষরে:
"রক্ত।"
সেই একটি শব্দ যেন পুরো কক্ষের নিস্তব্ধতাকে ভেঙে চুরমার করে দিল। রোহানের হাতে থাকা ম্যাগনিফাইং গ্লাসটা মৃদু কেঁপে উঠলো। সে অনুভব করলো, তার গ্লাভসের নিচে তার হাতের তালু ঘামে ভিজে উঠেছে। এই নিস্তব্ধ, ধূলোমাখা লাইব্রেরির গভীরে, এই প্রাচীন বইয়ের পাতায় লুকিয়ে থাকা এই একটি শব্দ, তার মনে এক তীব্র অস্বস্তি আর অজানা আশঙ্কার জন্ম দিল। রক্ত? কেন এই শব্দ? কার রক্ত? সে কাগজটি সাবধানে তুলে ধরল, তার মন যেন সহস্র প্রশ্নের জালে জড়িয়ে গেল। এই একটি শব্দ যেন এক বিস্তৃত গল্পের সূচনা, যার প্রতিটি বাঁকে লুকিয়ে আছে এক নিদারুণ রহস্য।
সে অনুভব করলো, এই লাইব্রেরি কেবল পুরনো বই আর ধুলোর আস্তরণ নিয়ে দাঁড়িয়ে নেই, এর গভীরে লুকিয়ে আছে এমন কিছু যা সম্ভবত অধ্যাপক সেনও পুরোপুরি উন্মোচন করতে পারেননি। তার চারপাশের বাতাস যেন হঠাৎ করেই আরও ঘন, আরও রহস্যময় হয়ে উঠেছে। সেই "রক্ত" শব্দটি তার মস্তিষ্কের প্রতিটি কোষে যেন এক নতুন সুর বাজিয়ে তুলছিল, এক সুর, যা বিস্মৃত অতীতে পৌঁছানোর একমাত্র পথ।
---
---
**উপন্যাস: বিস্মৃত সুর**
**প্রথম পর্ব**
হেমন্তের এক বিষণ্ণ দুপুর। বাইরে রোদ ছিল কিনা, রোহান তা ঠিক ঠাহর করতে পারছিল না। লাইব্রেরির একমাত্র জানালাটা এতটাই ধূলো আর কালচে আস্তরণে ঢাকা ছিল যে, বাইরের পৃথিবীর আলো সেখানে পৌঁছাতে পৌঁছাতে যেন তার সমস্ত প্রাণশক্তি হারিয়ে ফেলত। শুধু এক ফালি ম্লান, হলদেটে আভা এসে পড়ত মেঝের ওপর, আর সেই আলোকরশ্মির মধ্যে লক্ষ লক্ষ ধূলিকণা যেন এক অদৃশ্য নৃত্যে মেতে উঠত, তাদের অস্তিত্ব জানান দিত এই নীরব, বিস্মৃত কক্ষের গভীরে। বাতাসের মধ্যে একটা অদ্ভুত গন্ধ মিশে ছিল – পুরনো কাগজ, ধুলো, আর দীর্ঘদিনের অবহেলায় জমে ওঠা স্যাঁতসেঁতে কাঠের এক মিশ্র গন্ধ। ঠিক যেন সময় নিজেই এই গন্ধের রূপ ধরে শ্বাস ফেলছে এই বিশাল, নীরব ঘরের আনাচে-কানাচে।
রোহান তার হাতের সাদা গ্লাভস জোড়া আরেকটু টেনে নিলো। গত তিন সপ্তাহ ধরে এই কাজটিই তার একমাত্র সঙ্গী। অধ্যাপক অরুণিমা সেনের এই বিশাল ব্যক্তিগত সংগ্রহটি গুছিয়ে, তালিকাভুক্ত করে একটি ডিজিটাল আর্কাইভে রূপান্তরিত করার দায়িত্ব তার ওপর। অধ্যাপক সেন ছিলেন একজন নির্জনতাপ্রিয় মানুষ, যিনি তার জীবনের প্রায় পুরোটাই ব্যয় করেছেন বিস্মৃত ইতিহাস আর হারিয়ে যাওয়া পুঁথিপত্র পুনরুদ্ধারে। মৃত্যুর পর তার এই বিশাল সংগ্রহের দায়িত্ব এখন বিশ্ববিদ্যালয়ের হাতে, আর সেই ভার পড়েছে রোহানের কাঁধে।
কাঠের মেঝেতে তার বুটের মৃদু শব্দ, নিস্তব্ধতার অতল গভীরে যেন এক ক্ষুদ্র ঢেউ তুলছিল। প্রতিটি পদক্ষেপে মেঝেটা সামান্য কেঁপে উঠতো, আর সেই কম্পনে পুরনো বইয়ের সেলফগুলো থেকে সূক্ষ্ম ধুলোর কণা ঝরে পড়তো বাতাসের মিহিন স্তরে। ঘরের এক কোণে, একটি বিশাল, মেহগনি কাঠের টেবিলের ওপর সে তার কাজ শুরু করেছিল। টেবিলটি নিজেই যেন শত শত বছরের গল্প ধারণ করে আছে। তার মসৃণ পৃষ্ঠে অসংখ্য আঁচড়, গভীর দাগ, আর কালির ছোপ লেগে আছে, যা হয়তো কোনো এক রাতে, কোনো এক গভীর চিন্তামগ্ন হাতের অবদানে তৈরি হয়েছিল। রোহান তার হাতের তালু আলতো করে টেবিলের সেই মসৃণ, শীতল পৃষ্ঠের ওপর রাখল, যেন সে সেই কাঠের গভীরে লুকিয়ে থাকা অতীতে পৌঁছানোর চেষ্টা করছে।
চোখের সামনে হাজার হাজার বই, একের পর এক সেলফ জুড়ে, সিলিং পর্যন্ত উঁচু হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। প্রতিটি বইয়ের মলাট, প্রতিটি পাতার ভাঁজ যেন এক ভিন্ন গল্প, এক ভিন্ন সময়ের টুকরো। কিছু বইয়ের মলাট ছিল জীর্ণ, চামড়া খসে পড়া; কিছু বইয়ের অক্ষর ছিল হাতে লেখা, কালি ফিকে হয়ে যাওয়া; আবার কিছু বইয়ের মলাট ছিল উজ্জ্বল, আধুনিক বাঁধাইয়ের ঝলকানি, যা বলে দিত অধ্যাপক সেনের সংগ্রহটি সময়ের সাথে সাথে কীভাবে বিবর্তিত হয়েছে। রোহান একটি সেলফের সামনে এসে দাঁড়ালো, যেখানে সারি সারি হলুদ হয়ে যাওয়া পুঁথি আর পাণ্ডুলিপি রাখা ছিল। সে ধীরে ধীরে তার আঙুলগুলো প্রতিটি বইয়ের পিঠের ওপর বুলিয়ে নিচ্ছিল, যেন সে তাদের ভাষা বুঝতে চাইছে। প্রতিটি স্পর্শে এক নতুন অনুভূতি, এক নতুন নীরবতা।
আজ তার কাজ ছিল সেলফ-৭ এর মাঝামাঝি অংশ থেকে বইগুলো নামিয়ে, ধুলো ঝেড়ে, এবং তাদের বর্তমান অবস্থা নোট করে রাখা। সে একটি ছোট মই টেনে নিয়ে এল, যা নিজেই সম্ভবত এই লাইব্রেরির মতোই প্রাচীন। মইয়ের ধাপে পা রাখতেই কাঠের পুরনো শিড়দাঁড়া থেকে এক ক্রন্দনধ্বনি বেরিয়ে এলো, যা প্রতিধ্বনিত হলো ঘরের প্রতিটি কোণায়। রোহান সাবধানে ওপরে উঠলো। তার শ্বাস-প্রশ্বাস এখন যেন আরও ভারী হয়ে উঠেছে। এই উচ্চতা থেকে পুরো ঘরটিকে এক নতুন চোখে দেখা যাচ্ছিল। মাথার ওপর সিলিংয়ে বিশাল বিশাল মাকড়সার জাল, তাদের সুতোয় আটকে থাকা ধুলোর কণাগুলো রহস্যময় নকশা তৈরি করেছে।
সে সেলফের মাঝ বরাবর থেকে একটি ভারী, চামড়ার বাঁধানো বই টেনে বের করলো। বইটির ওপর ধুলোর পুরু আস্তরণ জমে ছিল, যা তার হাতের গ্লাভসের ওপর সাদাটে ছোপ ফেলে গেল। সে বইটিকে সাবধানে টেবিলে নামিয়ে রাখলো। বইটির ওজন ছিল তার ধারণার চেয়েও বেশি। মলাটটি ছিল गहरे বাদামী রঙের, তার ওপর কোনো নাম বা লেখকের চিহ্ন ছিল না, শুধু মাঝখানে একটি অদ্ভুত, প্রায় মুছে যাওয়া প্রতীক খোদাই করা ছিল – একটি বৃত্তের মধ্যে একটি পাখির ডানার মতো দেখতে কিছু একটা। প্রতীকটি এতই অস্পষ্ট যে, প্রথম দেখায় তা চোখে পড়াই কঠিন। রোহান তার বৃদ্ধাঙ্গুল দিয়ে প্রতীকটির ওপর ধীরে ধীরে বুলিয়ে নিল, যেন সে এর গভীরে কোনো গোপন বার্তা খুঁজে ফিরছে।
তার কৌতূহল সামান্য বেড়ে গেল। অধ্যাপক সেনের সংগ্রহে এমন কোনো নামহীন বই সে এর আগে দেখেনি। তিনি প্রতিটি বইয়ের উৎস, লেখক, এবং প্রকাশকাল সম্পর্কে খুঁটিয়ে নোট রাখতেন। এই বইটির কোনো নোট নেই কেন? সে বইটির পাতা ওল্টাতে শুরু করলো। প্রথম কয়েকটি পাতা ছিল সম্পূর্ণ ফাঁকা, তার পরের পাতাগুলোয় হাতে লেখা কিছু অক্ষর, যা কোনো পরিচিত ভাষায় লেখা বলে মনে হচ্ছিল না। অক্ষরগুলো ছিল সূক্ষ্ম, বাঁকানো, এবং কালচে বাদামী কালিতে লেখা। কালির রঙ এতটাই গাঢ় যে, দেখে মনে হচ্ছিল যেন রক্ত শুকিয়ে গেছে।
রোহান একটি ম্যাগনিফাইং গ্লাস বের করে সেই অক্ষরগুলোর ওপর ধরল। প্রতিটি অক্ষর যেন এক একটি রহস্যের টুকরো, তার চোখের সামনে উদ্ভাসিত হচ্ছিল। সে বহু প্রাচীন ভাষা নিয়ে পড়াশোনা করেছে, কিন্তু এমন লিখনশৈলী সে আগে কখনো দেখেনি। অক্ষরগুলো দেখে মনে হচ্ছিল যেন কোনো চিত্রলিপির অংশ, কিন্তু তাদের মধ্যে এক ধরনের ছন্দ ছিল যা তাকে গভীরতর কোনো অর্থের ইঙ্গিত দিচ্ছিল। সে আরও গভীরে প্রবেশ করলো। পাতা ওল্টাতে ওল্টাতে সে এক অদ্ভুত জিনিসের মুখোমুখি হলো।
বইয়ের মাঝখানে, যেখানে পাতাগুলো মোটা সুতো দিয়ে সেলাই করা ছিল, সেখানে একটি ছোট্ট, প্রায় অদৃশ্য ভাঁজ ছিল। ভাঁজটি এতই সূক্ষ্ম যে, যদি সে প্রতিটি পাতা এতটা মনোযোগ দিয়ে না দেখত, তবে হয়তো তা তার চোখ এড়িয়ে যেত। তার মনে হলো, কেউ যেন অত্যন্ত সতর্কতার সাথে কিছু একটা লুকিয়ে রেখেছে এই বইয়ের গভীরে। তার হৃদস্পন্দন সামান্য দ্রুত হলো। এই নিস্তব্ধ ঘরে, শুধুমাত্র তার নিজের শ্বাসপ্রশ্বাস আর হৃদস্পন্দনের শব্দই যেন গমগম করে উঠছিল। সে অত্যন্ত সাবধানে, তার হাতের সূক্ষ্ম যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে ভাঁজটি খুলতে চেষ্টা করলো।
ভাঁজটি খুলতেই বেরিয়ে এলো একটি ছোট্ট, পাতলা কাগজের টুকরো। কাগজটি ছিল প্রায় স্বচ্ছ, এবং তার ওপর লেখা ছিল একটি মাত্র শব্দ, অত্যন্ত সূক্ষ্ম অক্ষরে:
"রক্ত।"
সেই একটি শব্দ যেন পুরো কক্ষের নিস্তব্ধতাকে ভেঙে চুরমার করে দিল। রোহানের হাতে থাকা ম্যাগনিফাইং গ্লাসটা মৃদু কেঁপে উঠলো। সে অনুভব করলো, তার গ্লাভসের নিচে তার হাতের তালু ঘামে ভিজে উঠেছে। এই নিস্তব্ধ, ধূলোমাখা লাইব্রেরির গভীরে, এই প্রাচীন বইয়ের পাতায় লুকিয়ে থাকা এই একটি শব্দ, তার মনে এক তীব্র অস্বস্তি আর অজানা আশঙ্কার জন্ম দিল। রক্ত? কেন এই শব্দ? কার রক্ত? সে কাগজটি সাবধানে তুলে ধরল, তার মন যেন সহস্র প্রশ্নের জালে জড়িয়ে গেল। এই একটি শব্দ যেন এক বিস্তৃত গল্পের সূচনা, যার প্রতিটি বাঁকে লুকিয়ে আছে এক নিদারুণ রহস্য।
সে অনুভব করলো, এই লাইব্রেরি কেবল পুরনো বই আর ধুলোর আস্তরণ নিয়ে দাঁড়িয়ে নেই, এর গভীরে লুকিয়ে আছে এমন কিছু যা সম্ভবত অধ্যাপক সেনও পুরোপুরি উন্মোচন করতে পারেননি। তার চারপাশের বাতাস যেন হঠাৎ করেই আরও ঘন, আরও রহস্যময় হয়ে উঠেছে। সেই "রক্ত" শব্দটি তার মস্তিষ্কের প্রতিটি কোষে যেন এক নতুন সুর বাজিয়ে তুলছিল, এক সুর, যা বিস্মৃত অতীতে পৌঁছানোর একমাত্র পথ।
---